মেনু নির্বাচন করুন

ছবি
শিরোনাম
রাণী এখন রাজাবাড়িতে
বিস্তারিত

নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা বলেছেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক কিছুই করেছে। তবে এই কাজকে বিস্তৃত করতে বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছু করতে হবে। এই লক্ষ্যেই এখানে এসেছি। তিনি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সম্প্রসারণে গরিব মানুষের জন্য বীমা, ঋণ ও সঞ্চয় সুবিধা নিশ্চিতের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

 
 

রানী ম্যাক্সিমা মঙ্গলবার গাজীপুরে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের উন্নয়নের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক বিশেষ অ্যাডভোকেট হিসেবে সোমবার তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন। রানী ম্যাক্সিমা বলেন, পোশাক শিল্পের কর্মীদের বাংলাদেশে ‘বিকাশের’ মাধ্যমে মজুরি দেয়া হচ্ছে। মোবাইল ফোনভিত্তিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গার্মেন্ট কর্মীরা গ্রামে অর্থ পাঠাচ্ছেন। সত্যিকার অর্থে অতীতে এটা সম্ভব ছিল না।

 

ডাচ রানী বলেন, এটা সম্পূর্ণ নতুন ও ভালো উদ্ভাবন। প্রযুক্তির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। জনগণের বীমা, ঋণ ও সঞ্চয়ের সুবিধা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এখনও বাংলাদেশে অনেক মানুষ রয়েছেন যাদের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট নেই, যার মাধ্যমে তারা নিরাপদে তাদের অর্থ আত্মীয়-স্বজনদের কাছে পাঠাতে পারেন।

 

ম্যাক্সিমা বলেন, গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংকের শাখা খুবই ব্যয়বহুল। কিন্তু ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রত্যেক মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় আনা প্রয়োজন। এটা সম্ভব বীমা, ঋণ ও সঞ্চয় সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। আমরা গরিব জনগণকে অপেক্ষাকৃত ভালো ও সহজতর জীবন দিতে পারি।

 

দক্ষিণ এশিয়ায় অপরাপর দেশের সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে ডাচ রানী বলেন, একে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা খুবই কঠিন। আর্থিক ব্যবস্থা একেক দেশের একেক রকম। আমরা অন্য দেশ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক এটুআই প্রকল্পের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটি একটি ভালো দৃষ্টান্ত- যা অন্য দেশ অনুসরণ করতে পারে।

 

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, ডাচ রানী তার আগে গাজীপুর জেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার পরিদর্শন করেন। এটুআই প্রকল্পের অধীনে দেশব্যাপী ইউনিয়ন পর্যায়ে যে ডিজিটাল সেন্টার চালু করা হয়েছে, এটি তার একটি। তিনি গাজীপুর এলাকায় ভিয়েলাটেক্স পোশাক কারখানাও পরিদর্শন করেন। রানী একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ব্র্যাকের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গ্রাহক ঝর্ণা ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন।

 

রানী পোশাক কারখানায় শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে কর্মীরা বিশেষ করে নারী কর্মীরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগের মাধ্যমে কীভাবে সুফল পাচ্ছেন সে বিষয়ে জানতে চান। তিনি কারখানার একটি ফ্লোর পরিদর্শন করেন এবং তার উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন। তিনি কম আয়ের কর্মী বিশেষ করে গার্মেন্ট কর্মীরা কীভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন পেয়ে থাকেন, সে সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

 

ডাচ রানীর গাজীপুর পরিদর্শনকালে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ, নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মুহাম্মদ বেলাল, ঢাকায় ডাচ রাষ্ট্রদূত লিওনি মার্গারেথা কুইলিনারি, ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ওয়াটকিনস, এটুআই প্রকল্পের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন কর্মসূচির সমন্বয়কারী তৌহিদ হাসান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

 

ডাচ রানী বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে এই সফরে এসেছেন। তার এই সফর সফলের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা কর্মকাণ্ডের অংশ। জাতিসংঘ ২০৩০ সাল মেয়াদি যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার অধীনে দারিদ্র্যবিমোচন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করা এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও অন্যান্য উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে অন্যতম মাধ্যম হল আর্থিক সেবার সুবিধা সবার জন্য নিশ্চিত করা।

 

কড়া নিরাপত্তায় ফুলেল শুভেচ্ছা : ঢাকা (উত্তর) প্রতিনিধি জানান, রানী ম্যাক্সিমার টঙ্গীর গাজীপুর এলাকায় ভিয়েলাটেক্স গার্মেন্ট কারখানা পরিদর্শন উপলক্ষে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো টঙ্গী এলাকা নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে নিয়ে আসেন। কড়া নিরাপত্তায় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ডাচ রানী ভিয়েলাটেক্স কারখানায় প্রবেশ করেন। এ সময় কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে স্বাগত জানান। সেখানে তিনি কারখানার পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়া ও কর্মপরিবেশ ঘুরে দেখেন। রানীর আগমন উপলক্ষে ভিয়েলাটেক্স কারখানা প্রাঙ্গণে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা ফটক তৈরি করা হয়। পরে তিনি পৌনে ৯টার দিকে ভিয়েলাটেক্স কারখানা ত্যাগ করে গাজীপুরের শ্রীপুরের রাজাবাড়িতে যান। সেখানে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টার পরিদর্শন করেন। পরে ব্র্যাকের আওতাধীন বিকাশ এজেন্ট অফিস ঘুরে দেখেন। তিনি দুপুর সাড়ে ১২টায় টঙ্গীর দত্তপাড়ায় ঝর্ণা ফেব্রিক্স অ্যান্ড ফ্যাশন হাউস পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ঝর্ণা ফ্যাশনের মালিক ঝর্ণা ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন। এ ব্যাপারে ঝর্ণা ইসলাম বলেন, রানী তাকে একটি ফ্লোর নিয়ে কাপড় তৈরি করতে যা যা লাগে, সেসব কিছু দেয়ার আশ্বাস দেন এবং তার কারখানার খোঁজখবর নেন।

 

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে রানীর সন্তোষ প্রকাশ : বাংলাদেশে চলমান আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা। তবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে যে কাজ করছে সেটা সমন্বিতভাবে হলে আরও ভালো হবে বলে মনে করেন তিনি। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক এএফএম আসাদুজ্জামান।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে প্রথমে তিনি গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে একান্ত আলাপ করেন। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠক শেষে ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল’ শীর্ষক এক সেমিনারে অংশ নেন। গভর্নরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী, নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত শেখ মো. বেলাল, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিয়োনি মারগেরেথা কিরোনে, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান আলী রেজা ইফতেখারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ৪৫ জন প্রতিনিধি।

 

সেমিনারে উত্থাপিত পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং, এসএমই ঋণ, নারী উদ্যোক্তা ঋণসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব উদ্যোগের ফলে গত কয়েক বছর ধরে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হচ্ছে। সামনের দিনেও এ ধারা অব্যাহত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছে।